আফগান নারীরা অস্তিত্ব সংকটে? – News Vibe24

DesheBideshe

কাবুল, ১৩ সেপ্টেম্বর – তালেবান গোষ্ঠী রাজধানী কাবুলের প্রাণকেন্দ্রে প্রবেশ করার পর থেকে পুরো বিশ্ব আফগানিস্তানের দিকে মনোনিবেশ করতে শুরু করেছে। জুলাই মাসে আমেরিকান এবং ন্যাটো বাহিনীর আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করার পর থেকে দেশের একটি বিশাল অংশ তালেবানরা দ্রুতগতিতে দখল করেছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে গেছে এবং এর মাধ্যমে সরকারের পতন হয়েছে।

তালেবানদের ক্ষমতাসীন হওয়ার মাধ্যমে মানবাধিকার, বিশেষত যারা নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করেন, তাদের কঠোর পর্যবেক্ষণে আনা হয়েছে। বিগত ৯০’র দশকে আফগানিস্তানের মুজাহিদিন সরকারের সময়ে নারীর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বন চুক্তির মাধ্যমে কারজাই সরকার গঠনের পর থেকে জাতীয় পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ যদিও কিছুটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান গোষ্ঠীভুক্ত সম্প্রদায় হওয়ার কারণে নারীর অধিকার রক্ষা করার জন্য আফগান নেতৃত্ব থেকে খুবই কম সমর্থন পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, জাতীয় পর্যায়ে আফগান নেতাদের স্ত্রীদের কার্যত কোনও প্রকার অংশগ্রহণ নেই এবং কারজাই ও গনি সরকারের ক্ষেত্রেও তা সত্য। বিশেষত শীর্ষ আফগান নেতাদের পরিবার বিদেশে বসবাস করে। আব্দুল্লাহর পরিবার ভারতে; রশিদ দোস্তামের পরিবার আঙ্কারায় বসবাস করে যেখান থেকে তারা আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে।

আফগানিস্তানের জনগণের মাঝে তালেবানরা তাৎক্ষণিক ভীতি সঞ্চার করা ছাড়াও তারা পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে একত্রে কাজ করার বিষয়টিও ভেবে দেখছে। তাছাড়াও এখানে আরেকটি ভয় কাজ করছে, তা হলো তালেবানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। মনে হচ্ছে, এবার তারা দেশে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার জন্য হঠাৎ কোনও পরিকল্পনা করেছে।

গত বিশ বছরে আফগানিস্তানে নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। তবে আবারও তালেবানের শাসন ফেরায় হুমকির মুখে আফগান নারীরা। তিনটি ঘটনা কোনও স্বস্তির খবর দেয় না।

এক. জুলাইয়ের প্রথম দিকে বাদাখশান ও তাখার প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের কাছে একটি আদেশ জারি করে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে মেয়েদের, ৪৫ বছরের নিচে থাকা বিধবাদের একটি তালিকা চাওয়া হয়েছিল তালেবান যোদ্ধাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য।

এটি তিন ধরনের উদ্দেশ্য বলে ধরে নেওয়া যায়- সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে জোরপূর্বক আনুগত্য আদায় করে নেওয়া, নারীদের দমিয়ে রাখা এবং সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারে তালেবান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা। ওই এলাকার নারী এবং তাদের পরিবারের মাঝে এই আদেশ ভীতি সঞ্চার করেছে। তাদের পালাতে বাধ্য করছে এবং আঞ্চলিক বাস্তুচ্যুত জনগণের সারিতে স্থান দিচ্ছে, যা আফগানিস্তানের মানবিক বিপর্যয়কে ক্রমশ প্রকাশ করছে। বিগত তিন মাসে প্রায় নয় লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

দুই. আফগানিস্তান দখল নিশ্চিত করার পর হেরাতে প্রদেশে প্রথম ফতোয়া জারি করে তালেবান। ফতোয়া অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করতে পারবেন না ছেলেমেয়েরা।

তিন. গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ১৫ যোদ্ধার জন্য খাবার রান্নার আদেশ অমান্য করায় এক নারীকে একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে তালেবানরা।
দিন দিন আফগান পরিস্থিতি ভীতিকর দিকে বাঁক নিচ্ছে। বিশেষত, নারীর অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও তীব্রতর হচ্ছে। তালেবান নেতৃত্বের অধীনে আফগান নারীরা যে বিপদের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে সেই বিষয়ে আফগানিস্তান এবং সারা বিশ্বের নারী সংগঠনগুলো বিপদের আশঙ্কা করছে। এখানে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ রয়েছে যে নারীর অধিকারসহ শিক্ষার অধিকার আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

১৯৯৬ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে তালেবান শাসনামলে নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের কোনও সুযোগ ছিল না। অধিকাংশ পেশায় নারীদের কাজের অনুমতি ছিল না। নারীরা তাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখতে বাধ্য হতো। কোনও নারী ব্যভিচারী হিসেবে অভিযুক্ত হলে তাকে জনসম্মুখে অত্যাচার করা হতো। তাদের চলাচলের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ ছিল। তারা তাদের নিকট পুরুষ আত্মীয়ের সঙ্গ ছাড়া গৃহত্যাগের অনুমতি ছিল না। তাছাড়া তাদের অন্যায়ভাবে শাস্তি পেতে হতো।

যদিও সবাই নারীর অধিকার নিয়ে চিন্তিত কিন্তু এখন পর্যন্ত তালেবান কোনও সুস্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি যে তারা তাদের অবস্থান থেকে কীভাবে কাজ করবে। যেখানে আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাদের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে তালেবান কীভাবে নারীদের সঙ্গে কাজ করবে।

উদাহরণস্বরূপ, এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি জালমি খালিলজাদ, যিনি আফগানিস্তানের শান্তিচুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন, তাকে তালেবানরা কীভাবে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলবে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। এর জবাবে তিনি বলেছেন, এটি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এটি তালেবান ও আফগান সরকার নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও মোকাবিলা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ বিষয়ে কোনও ভূমিকা নেই। যদিও তার বক্তব্য যথেষ্ট হতাশাজনক ছিল কিন্তু এটি সবার চোখ খুলে দিয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, তালেবান অবস্থানে রয়েছে এবং আফগানিস্তানে নারী ও নারীদের সঙ্গে আচার-ব্যবহারের সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

এমনকি, দোহা চুক্তির সময় কোনও পক্ষই নারীদের অধিকার নিয়ে তালেবানের সঙ্গে কথা বলেনি। নারীর অধিকার নিয়ে আমরা কোনও নিশ্চয়তা পাইনি বা আশ্বস্ত হতে পারিনি যে সেটা কি বিশ্বাসঘাতকতা হবে না আপস করা হবে। এখনও যেসব এলাকা তালেবানের দখলে রয়েছে সেখানকার নারীরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের অধীনে নারীদের সঙ্গে যে কঠোর আচরণ করা হবে সেই ভয়টাই বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। তালেবান শাসনের পুনর্জাগরণের কথা চিন্তা করে আফগান নারীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

এ পরিস্থিতিতে, পুরো বিশ্বের নারীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা জরুরি প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজ, চলাফেরার স্বাধীনতা, এমনকি জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তা করা প্রয়োজন। নারীদের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং মধ্যস্থতায় তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশ্বের সব সরকারকে আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং বিশ্বব্যাপী থাকা নিয়মগুলোর প্রচলন করতে হবে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
এম ইউ/১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

(function(d, s, id){
var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0];
if (d.getElementById(id)) return;
js = d.createElement(s); js.id = id;
js.src = “https://connect.facebook.net/bn_BD/sdk.js#xfbml=1&version=v3.2”;
fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs);
}(document, ‘script’, ‘facebook-jssdk’));